নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত ভাসানচর নিয়ে নতুন করে সীমানা বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসছে জেলার সর্বস্তরের মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কার্যক্রম হাতিয়ার অধীন পরিচালিত হলেও সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখার এক চিঠিকে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—ভাসানচর আসলে কার সীমানায়?
জানা গেছে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ শাখা ভাসানচরের অবস্থান সন্দ্বীপের দিকে উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই নোয়াখালীজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের মীমাংসিত একটি বিষয়কে ঘিরে অযথা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
গত শতকের ১৯৯৪–৯৫ সালের দিকে বঙ্গোপসাগর ও মেঘনা মোহনায় হাতিয়ার সীমানায় জালিয়ার চর, ঠেঙ্গার চরসহ একাধিক নতুন চর জেগে ওঠে। ২০১০ সালের দিকে দৃশ্যমান হয় বর্তমান ভাসানচর। হাতিয়ার নলচিরা রেঞ্জ সূত্রে জানা যায়, ২০০২–২০০৩ সালেই নোয়াখালী বনবিভাগ সেখানে বনায়ন কার্যক্রম শুরু করে।
২০১৭ সালে রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর ভাসানচর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনায় আসে। বর্তমানে দ্বীপটিতে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পসহ রাষ্ট্রীয় সব ধরনের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কার্যক্রম হাতিয়া উপজেলা প্রশাসনের অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে।
১৯১৩–১৬ সালের নোয়াখালী সীমানা নির্ধারণী মানচিত্রে হাতিয়ার উত্তর-পূর্বে হরনী ও চানন্দী ইউনিয়নের আন্ধারমানিক–সাগরদী এলাকা চিহ্নিত ছিল, যা ১৯২০ সালের নদীভাঙনে বিলীন হয়ে যায়।
১৯৫০ ও ১৯৬২ সালে রামগতি ও মান্নান নগরে বাঁধ নির্মাণের ফলে মেঘনা মোহনায় ভাঙন তীব্রতর হয়। এতে নীলক্ষী-চরবাটা, হরনী, চানন্দীসহ হাতিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়। প্রায় ৭০ বছরে হাতিয়ার প্রায় ৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ভেঙে গেছে, যা নতুন চর জাগার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ বলে মনে করা হয়।
২০১২ সালের ১৯ নভেম্বর পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ১৮ ডিসেম্বর সরকারি গেজেটে ভাসানচরকে নোয়াখালী জেলার অধীন নতুন জেগে ওঠা চরভূমি হিসেবে প্রকাশ করা হয়। সেখানে চার মাসের মধ্যে কোনো দাবিদার থাকলে প্রমাণসহ আবেদন করার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কোনো আপত্তি বা দাবি উত্থাপিত হয়নি।
এর ধারাবাহিকতায় চরটিকে হাতিয়ার সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৩ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ হাতিয়ার ০৫ নম্বর চরঈশ্বর ইউনিয়নের ছয়টি মৌজা—ভাসানচর, শালিক চর, চর বাতায়ন, চর মোহনা, চর কাজলা ও কেওডার চর—নিয়ে ‘ভাসানচর থানা’ গঠন করে। একই বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আন্তঃজেলা সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে গঠিত কারিগরি টিম ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর ভাসানচর পরিদর্শন করে। সেখানে ১৯৩৫ সালের নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার সি.এস. নকশা এবং ১৯৫৪ সালের চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলার সি.এস. নকশা উল্লেখ করে চরটির অবস্থান সন্দ্বীপমুখী দেখানো হয়।
তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করিয়ে দেন, ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত সন্দ্বীপ নোয়াখালী জেলারই অংশ ছিল এবং হাতিয়া কোর্টের একতিয়ারভুক্ত ছিল। ১৯৫৫ সালে সন্দ্বীপ চট্টগ্রাম জেলার সঙ্গে যুক্ত হয়।
সামাজিক সংগঠন সচেতন নাগরিক সমাজ–হাতিয়ার সাধারণ সম্পাদক মহিব্বুল মাওলা বলেন, বনবিভাগের গেজেট প্রকাশের সময় কিংবা দিয়ারা জরিপ মৌসুমে সন্দ্বীপের পক্ষ থেকে কোনো দাবি আসেনি। তার অভিযোগ, একটি মহল প্রভাব খাটিয়ে বিষয়টি পুনরুজ্জীবিত করছে।
নোয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সদস্য অ্যাডভোকেট মো. নুরুল ইসলাম বলেন,
“ভাসানচর নিয়ে সরকারের দুইটি গেজেট রয়েছে। এটি একটি মীমাংসিত বিষয়। অকারণে দুই ভ্রাতৃপ্রতিম এলাকার মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টা হচ্ছে।”
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ঐতিহাসিক দলিল, সরকারি গেজেট ও মানচিত্র অনুযায়ী ভাসানচর হাতিয়ার সীমানার মধ্যেই পড়ে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন,
২০১২ সালে বনবিভাগের গেজেটের বিষয়টি সাম্প্রতিক আলোচনায় উপস্থাপন করা হয়নি—এটি দুঃখজনক।
ঐতিহাসিক দলিল, সরকারি গেজেট, প্রশাসনিক বাস্তবতা ও দীর্ঘদিনের কার্যক্রম—সব দিক বিবেচনায় ভাসানচর হাতিয়া উপজেলার অংশ হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি না করে বিদ্যমান গেজেট ও আইনগত অবস্থানকে সম্মান করাই হবে রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য মঙ্গলজনক।
You cannot copy content of this page