
নিউজ ডেস্ক:
দেখতে দেখতে অবসান হতে যাচ্ছে সকল জল্পনা কল্পনার। আগামীকাল (১০ ফেব্রুয়ারি) প্রচারণার শেষ দিন। দীর্ঘ প্রায় তিন সপ্তাহের টানা গণসংযোগ, মিছিল, পথসভা, উঠান বৈঠক ও ব্যক্তি যোগাযোগের পর এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে- কে হচ্ছেন হাতিয়ার এমপি?
প্রচারণার শেষ প্রান্তে এসে নোয়াখালী–৬ (হাতিয়া) আসনের নির্বাচনী চিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চারমুখী লড়াইয়ে শুরু হওয়া ভোটযুদ্ধ কার্যত পরিণত হয়েছে আবদুল হান্নান মাসউদ ও মাহবুবের রহমান শামীমের মুখোমুখি দ্বন্দ্বে। অন্য প্রার্থীরা মাঠে প্রভাব রাখলেও শেষ হিসাবের অঙ্ক এই দুই প্রার্থীর মধ্যেই ঘনীভূত হচ্ছে।
২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠের প্রচারণা, উঠান বৈঠক, পথসভা এবং ভোটারদের মতামত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—কোথাও শাপলা কলি এগিয়ে, আবার কোথাও ধানের শীষ শক্ত অবস্থানে। ব্যবধান এতটাই কম যে, একে অপরের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে দুই পক্ষ।
ধানের শীষের শক্তি: সম্ভাব্য সরকার ও নীরব ভোট
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাহবুবের রহমান শামীমের প্রধান শক্তি দলীয় পরিচয়। বিএনপি সরকার গঠনের সম্ভাবনা—এই বার্তাটি ভোটারদের একটি বড় অংশের মধ্যে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে যারা মনে করেন, “সরকারি দলে এমপি থাকলে উন্নয়ন পাওয়া সহজ”—তারা ধানের শীষের দিকেই ঝুঁকছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হলো সাবেক আওয়ামী লীগ এমপি মোহাম্মদ আলীর সমর্থকদের একটি অংশ। মাঠে ক্রমশঃ দৃশ্যমান হয়ে উঠছেন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ। নিজেদের শেষ রক্ষার সুযোগ হিসেবে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে বলে রাজনৈতিক অন্দরমহলে আলোচনা চলছে। এই নীরব ভোট শেষ মুহূর্তে শামীমের পাল্লা ভারী করতে পারে।
তবে শামীমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—নিজ দলের ভেতরের বিভক্তি। বিএনপির একটি বড় অংশ এখনো স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে থাকায় ধানের শীষের ভোট পুরোপুরি এক জায়গায় জমাট বাঁধছে না। এছাড়াও পুরনো বিতর্কিত নেতৃবৃন্দকে ভেড়ানোর কারণে সাধারণ ভোটার ও ত্যাগী নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ার গুঞ্জনও রয়েছে।
শাপলা কলির শক্তি: ঐক্য ও উন্নয়নের বার্তা
এদিকে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আবদুল হান্নান মাসউদের বড় শক্তি হলো অটুট ঐক্য। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নেতাকর্মীরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একক প্রার্থীর পক্ষে মাঠে রয়েছেন, যা হাতিয়ার রাজনীতিতে এবার একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য।
এছাড়া নদীভাঙন রোধ, সড়ক সংস্কার, সিট্রাক–ফেরি–লঞ্চ বরাদ্দ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স উন্নীতকরণসহ দৃশ্যমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড হান্নান মাসউদকে “কথার রাজনীতির বাইরে বাস্তব কাজের মানুষ” হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। তরুণ ভোটার ও উন্নয়নমুখী ভোটারদের মধ্যে এই বার্তা বেশ সাড়া ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিরপেক্ষ ভোটারদের বড় একটি অংশ হান্নান মাসউদের দিকে ঝুঁকছে—যা তাকে শেষ মুহূর্তে শক্ত অবস্থানে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে নদী ভাঙন রোধের উদ্যোগে সুফলভোগী নদীতীরের ভোটারদের নিরঙ্কুশ সমর্থন রয়েছে হান্নানের পক্ষে। এর সাথে যোগ হয়েছে ফেরি সেবার মাধ্যমে দৃশ্যমান আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, হাতিয়ার প্রধান সড়কের উন্নয়ন, বেকের বাজার টু হিল্টন রোড সড়কের পুননির্মাণ কাজ। এসব উন্নয়ন হান্নান মাসউদের হাত ধরেই বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মুখে মুখে আলোচিত হচ্ছে।
ব্যবধান কমছে কেন?
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, এই দুই প্রার্থীর মধ্যে ব্যবধান এখন ভোটের হিসাবেও খুবই সামান্য। একেকটি ইউনিয়নে একেকজন এগিয়ে থাকলেও সামগ্রিক হিসাবে কেউই নিরঙ্কুশ সুবিধায় নেই। ধানের শীষ এগিয়ে আছে দলীয় আবেগ ও সরকার গঠনের প্রত্যাশা নিয়ে। অপরদিকে শাপলা কলি এগিয়ে আছে উন্নয়ন, ঐক্য ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়। এই দ্বৈত বাস্তবতাই নির্বাচনকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে।
শেষ মুহূর্তের নির্ণায়ক ফ্যাক্টর কী?
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে- ভোটের দিন বিএনপির বিভক্ত ভোট কতটা একত্র হয়, নীরব ভোটাররা শেষ মুহূর্তে কোন দিকে ঝোঁকে, তরুণ ও প্রথমবার ভোটারদের উপস্থিতি কতটা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’–‘না’ ইস্যু ভোটের আচরণে কতটা প্রভাব ফেলে
এই চারটি ফ্যাক্টরের যেকোনো একটি সামান্য এদিক–ওদিক হলেই ফলাফল পাল্টে যেতে পারে।
প্রেডিকশন: হাড্ডাহাড্ডি, তবে সামান্য এগিয়ে…
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণে হাতিয়ার কথা মনে করছে—
আবদুল হান্নান মাসউদ ও মাহবুবের রহমান শামীমের লড়াই হবে চূড়ান্ত ও অত্যন্ত কাছাকাছি। ভোটের মাঠে শেষ ২৪ ঘণ্টার গতিবিধির ওপর ফল নির্ভর করবে। সামান্য ব্যবধানে জয়–পরাজয় নির্ধারিত হতে পারে।
এই মুহূর্তের হিসাব অনুযায়ী, শাপলা কলি ও ধানের শীষ—দুই প্রতীকের ব্যবধান এতটাই কম যে, ভোটের দিন পর্যন্ত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ।
এদিকে দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রকৌশলী ফজলুল আজিম ও তানভীর উদ্দিন রাজিবকেও একেবারে উপেক্ষা করা যাচ্ছেনা। তাদের ব্যক্তিগত ইমেজ এবং হাতিয়াবাসীর ইতোপূর্বের ব্যক্তি রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা যদি পুনরুজ্জীবিত হয়, তবে এ দুজনের কোন একজনও হতে পারেন আগামীর এমপি।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান হাতিয়ার মানুষ শুধু একজন এমপি নয়—ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা বেছে নিতে যাচ্ছে। হাড্ডাহাড্ডি এই লড়াইয়ের শেষ শব্দটি লেখা হবে ব্যালট বাক্সেই।
মন্তব্য করুন
You cannot copy content of this page