পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পর বাংলাদেশের অন্যতম অপরূপ সমুদ্র সৈকত নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার জাহাজমারা ইউনিয়নের নিমতলী সমুদ্র সৈকত। শীত মৌসুম এলেই এই সৈকত যেন রূপ নেয় পাখির রাজ্যে। দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো উপকূল ।
প্রতি বছর তীব্র শীত থেকে বাঁচতে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসব পাখি ছুটে আসে নিমতলী সমুদ্র সৈকতে। খাদ্যের সন্ধান ও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজেই তাদের এই পরিযায়ন। এরই ধারাবাহিকতায় নিমতলী সমুদ্র সৈকত ও তৎসংলগ্ন হাতিয়ার চর এলাকা গুলো জুড়ে এখন দেখা মিলছে নানা রঙের এসব পরিযায়ী পাখির। কেউরাবনের সারি আর বালুকাবেলায় পাখিরা যেন খুঁজে পেয়েছে তাদের স্বর্গরাজ্য।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সৈকতের তীরে, জোয়ারের পানির ধার ঘেঁষে আর ভাটার সময় বিস্তৃত চরাঞ্চলে দল বেঁধে খাবার খুঁজছে বালিহাঁস, গাঙচিল ও বিভিন্ন প্রজাতির জলচর পাখি । ভোরের সোনালি রোদ আর বিকেলের হিমেল বাতাসে পাখির ওড়াউড়ি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে। স্থানীয় জেলেরা জানান, শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাখির সংখ্যাও বাড়ছে। নিমতলীর আশপাশের বন ও চরে এদের বিচরণ সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। নিঝুম দ্বীপের মতো হাতিয়ার এই অঞ্চলটিও পরিযায়ী পাখিদের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে উঠছে ।
পাখি দেখতে আসা দর্শনার্থী মোঃ শফিকুর রহমান বলেন, নিমতলীর সৌন্দর্য অনন্য। তার ওপর এখন শীতে এত পাখি দেখে মন ভরে গেছে। পরিবার নিয়ে বেড়াতে এসে পাখিদের কিচিরমিচির আর ওড়াউড়ি দেখে সত্যিই ভালো লাগছে। এই দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জেলে মনির হোসেন বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, শীত এলেই এই অঞ্চলে পাখি আসে। আগে হয়তো কেউ কেউ পাখি শিকার করত, কিন্তু এখন আমরা নিজেরাই সচেতন হয়েছি। অতিথি পাখিরা আমাদের এলাকার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। এদের রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
হাতিয়ার নবনির্বাচিত এমপি জনাব আবদুল হান্নান মাসউদ জানান, নিমতলী সমুদ্র সৈকত শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, এখন অতিথি পাখির জন্যও পরিচিতি পাচ্ছে। আমরা পর্যটকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে এবং পাখি শিকার রোধে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা আছে। পাখিদের যাতে কেউ বিরক্ত না করে বা শিকার করতে না পারে, সে ব্যাপারে আমাদের নজরদারি রয়েছে।
বাঁশখালীর মতো অন্যান্য উপকূলীয় অঞ্চলের পাখির অভয়ারণ্যের সঙ্গেই নিমতলীর নাম এখন উচ্চারিত হচ্ছে। পাখি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উপকূলীয় এই অঞ্চলগুলোতে পাখিদের অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে পারলে এবং পর্যটকদের জন্য দায়িত্বশীল পাখি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারলে, এটি হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্র ।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী পাখি শিকার ও হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ । ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইনের ২৬ ধারা এবং ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন অনুযায়ী পাখি নিধনের সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে । তাই অতিথি পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
নিঝুম দ্বীপের মতো হাতিয়ার এই অঞ্চলেও যদি পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা যায়, তাহলে আগামী দিনে নিমতলী সমুদ্র সৈকত পরিণত হতে পারে পাখি পর্যবেক্ষক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের আরেকটি প্রিয় গন্তব্যে । স্বল্প খরচে সহজ-সরল মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তা, নীল জলরাশি আর কেউরাবনের মায়ায় জড়ানো এই সৈকতে শীতের সকালে পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ যেন প্রকৃতির এক অপূর্ব সুর।
ভ্রমণ টিপস: যারা পাখি দেখতে আসবেন, তারা ভোর ও বিকেলের সময়টিকে বেছে নিতে পারেন, কারণ এ সময় পাখিদের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি থাকে। সাথে ভালো মানের বাইনোকুলার ও ক্যামেরা রাখতে পারেন দূর থেকে পাখি দেখার জন্য। সৈকত পরিষ্কার রাখা ও পাখিদের বিরক্ত না করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
You cannot copy content of this page