
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। তবে ভোটের দিন ঠিক কীভাবে, কোন কৌশলে এবং কতটা সূক্ষ্মভাবে এসব জালিয়াতি সংঘটিত হয়—সে অভিজ্ঞতা খুব কম মানুষই কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান। ১৭ বছরের চাকরি জীবনে একাধিক স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মুহাম্মদ মঈন উদ্দিন সম্প্রতি নিজের দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
তিনি জানান, দায়িত্বকালীন সময়ে এসব অভিজ্ঞতা কখনো প্রকাশ না করলেও, দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে জনস্বার্থে বিষয়গুলো সামনে আনা প্রয়োজন বলেই তিনি এখন মুখ খুলেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভোট জালিয়াতির সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল হলো একজনের ভোট আরেকজন দিয়ে দেওয়া। প্রযুক্তির উন্নতিতে এটি কিছুটা কঠিন হলেও, এখনো কেন্দ্রের ভেতর থেকে ‘সবুজ সংকেত’ মিললেই জাল ভোট দেওয়া শুরু হয়। পরিচয় যাচাই ছাড়াই নির্দিষ্ট স্লিপের মাধ্যমে একই ব্যক্তিকে একাধিকবার ভোট দিতে পাঠানো হয়—যতক্ষণ না কোনো প্রার্থীর এজেন্ট আপত্তি তোলে।
১: কৃত্রিম লাইন তৈরি করে ভোটার ফেরত
একটি কেন্দ্রে গিয়ে তিনি দেখেন, বাইরে দীর্ঘ লাইন অথচ ভেতরের বুথ ফাঁকা। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ কৌশল—লাইনের সামনে ২৫–৩০ জন পরিকল্পিতভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু ভোট দিতে ঢোকে না। ফলে প্রকৃত ভোটাররা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে বিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরে যান। প্রতিপক্ষের ভোট বেশি এমন কেন্দ্রগুলোতেই এই কৌশল প্রয়োগ করা হয়।
নারী ভোটারদের ক্ষেত্রেও ভিন্ন কৌশলে হয়রানি করা হয়—এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত ভোট না দিয়েই বাড়ি ফিরতে বাধ্য করা হয়।
২: ডামি এজেন্ট দিয়ে কেন্দ্র দখল
বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, প্রভাবশালী দলের এজেন্ট উপস্থিত থাকলেও অন্য প্রার্থীদের এজেন্ট ‘নেই’। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে সকালে হুমকি বা মারধরের মাধ্যমে তাদের বের করে দেওয়া হয়। কোথাও আবার প্রতিপক্ষের নামে ডামি এজেন্ট বসানো হয়—একজনের গলায় পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের প্রতীকের ব্যাজ ঝুলতে দেখা যায়।
৩: নারী বুথে সরাসরি ভোট নিয়ন্ত্রণ
নারী বুথগুলোতে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। কোথাও গোপন কক্ষে বসে থাকা ব্যক্তি ভোটারদের নির্দিষ্ট প্রতীকে সিল দিতে বাধ্য করছিলেন। কোথাও আবার গোপন কক্ষে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছিল না—সবার সামনে সিল মারতে বলা হচ্ছিল।
৪: ভুয়া সাংবাদিকের দাপট
আইনের সুযোগ নিয়ে অসংখ্য ভুয়া সাংবাদিক কার্ড ইস্যু করা হয়। এসব কার্ডধারীরা কেন্দ্রে ঢুকে ভোটারদের ভয় দেখানো, প্রভাবিত করা এবং জালিয়াতিতে সহায়তার কাজ করে। প্রশ্ন করলে তারা দ্রুত সরে পড়ে।
৫: নামসর্বস্ব নির্বাচন পর্যবেক্ষক
কিছু কেন্দ্রে ভুয়া নির্বাচন পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিও লক্ষ্য করা যায়। পরিচয় জানতে চাইলে তারা নির্দিষ্ট কোনো সংস্থার নাম বা দায়িত্ব ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়। পর্যবেক্ষণের বদলে তারা ভোট প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করছিল।
৬: ভয়ের পরিবেশ তৈরি
কিছু কেন্দ্রে বাইরে লোকজন থাকলেও ভেতরে কেউ ভোট দিতে যাচ্ছিল না। অনুসন্ধানে জানা যায়—ভেতরে বা আশপাশে মারধরের ঘটনা ঘটিয়ে ভয় তৈরি করা হয়েছে, যেন মানুষ ভোট দিতে না আসে।
৭: প্রকাশ্য সিল মারতে বাধ্য করা
একাধিক কেন্দ্রে ভোটারদের গোপন কক্ষে সিল দিতে দেওয়া হয়নি। এজেন্টদের সামনে সিল মারতে বাধ্য করা হয়েছে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় ভোট ‘সঠিক জায়গায়’ পড়েছে। অভিযোগ উঠলে সাময়িক নাটকীয় শাসন দেখানো হলেও বাস্তবে কিছুই বদলায়নি।
এছাড়া কেন্দ্র থেকে দূরে ভোটার আটকে দেওয়া, নারীদের এনআইডি কার্ড কেড়ে নেওয়া, বাড়ি থেকে বের হতে না দেওয়ার মতো ঘটনাও নিয়মিত ঘটেছে বলে তিনি জানান।
মুহাম্মদ মঈন উদ্দিন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, “আমি চাই এবারের নির্বাচন এসব অনিয়মমুক্ত হোক। তবে বাস্তবতা হলো—অনিয়মের চেষ্টা সব পক্ষই করবে। তাই সতর্কতা, শক্ত এজেন্টিং এবং সক্রিয় পর্যবেক্ষণই পারে ভোটের অধিকার রক্ষা করতে।”
মন্তব্য করুন
You cannot copy content of this page